চোখে পৃথিবীর আলো দেখতে পান না তাহমিনা আক্তার মৌমি। নিজ হাতে বইয়ের পাতা ধরে পড়া কিংবা খাতায় লিখে উত্তর দেওয়ার সুযোগও নেই তাঁর। পরীক্ষার হলে উত্তরপত্র পূরণ করতে হয়েছে শ্রুতিলেখকের সহযোগিতায়। তবু কোনো প্রতিবন্ধকতাই তাঁর স্বপ্নের পথে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারেনি। অদম্য ইচ্ছাশক্তি, অধ্যবসায় ও কঠোর পরিশ্রমের স্বীকৃতি হিসেবে এইচএসসি পরীক্ষায় জিপিএ-৫ অর্জন করেছেন তিনি।

সিলেটের সরকারি মদন মোহন কলেজ থেকে এ কৃতিত্ব অর্জন করেন মৌমি। তাঁর এই সাফল্য শুধু ভালো ফলাফলের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং প্রতিকূলতা জয় করে এগিয়ে যাওয়ার এক অনুপ্রেরণামূলক দৃষ্টান্ত।

মৌমী মৌলভীবাজারের জুড়ী উপজেলার জায়ফরনগর গ্রামের আব্দুল আহাদ ও আমিনা আক্তার পুষ্প দম্পতির মেয়ে। তিনি গ্রিন ডিসএবেল্ড ফাউন্ডেশনের (জিডিএফ) আবাসিক শিক্ষার্থী। দৃষ্টিপ্রতিবন্ধকতার কারণে শিক্ষাজীবনের শুরু থেকেই নানা চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হয়েছে তাঁকে। পড়াশোনার জন্য প্রয়োজন হয়েছে বাড়তি পরিশ্রম, ধৈর্য ও সহযোগিতার। কিন্তু কোনো কিছুই তাঁকে দমিয়ে রাখতে পারেনি।

এইচএসসি পরীক্ষায় মৌমির শ্রুতিলেখক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন হাজী আব্দুস সাত্তার উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী পল্লব রায়। পল্লবের সহযোগিতায় নিজের জানা বিষয়গুলো উত্তরপত্রে তুলে ধরেন মৌমি। উত্তরপত্রে লেখা অন্যের হাতে হলেও প্রতিটি উত্তরের পেছনে ছিল তাঁর নিজের মেধা, প্রস্তুতি ও দীর্ঘদিনের অধ্যবসায়।

মৌমির পরীক্ষায় অংশগ্রহণ ও সাফল্য অর্জনের পেছনে শিক্ষা বোর্ড কর্তৃপক্ষ এবং সরকারি মদন মোহন কলেজের সহযোগিতা ছিল গুরুত্বপূর্ণ। বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদিরসহ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সহমর্মিতা ও উদ্যোগও তাঁর জন্য পরীক্ষার পথ সহজ করেছে।

মৌমির এই অর্জন আবারও সামনে এনেছে প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের জন্য অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষাব্যবস্থার প্রয়োজনীয়তা। দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী কিংবা অন্য প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের মেধা বিকাশে উপযুক্ত শিক্ষা উপকরণ, শ্রুতিলেখক এবং প্রয়োজনীয় প্রাতিষ্ঠানিক সহযোগিতা নিশ্চিত করা জরুরি। কারণ, সমান সুযোগ পেলে তাঁরাও নিজেদের যোগ্যতা ও সামর্থ্যের স্বাক্ষর রাখতে পারেন।

গ্রিন ডিসএবেল্ড ফাউন্ডেশন কর্তৃপক্ষও মৌমির এমন সাফল্যে আনন্দিত। তাঁর জিপিএ-৫ দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের জন্য অনুপ্রেরণা হয়ে উঠেছে।

চোখে দেখতে না পেলেও নিজের ভবিষ্যৎ গড়ার স্বপ্নে অটুট মৌমি। তাঁর এই অর্জন মনে করিয়ে দেয়, শারীরিক সীমাবদ্ধতা কখনোই মানুষের মেধা, স্বপ্ন কিংবা সম্ভাবনার মাপকাঠি হতে পারে না। প্রয়োজন শুধু উপযুক্ত সুযোগ, সহযোগিতা ও এগিয়ে যাওয়ার পরিবেশ।