টাইম ট্রাভেল কি সত্যিই সম্ভব? মানুষ কি কখনো অতীতে ফিরে যেতে পারবে, কিংবা ভবিষ্যতের পৃথিবী ঘুরে আসতে পারবে? এমন প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে প্রথমেই সামনে আসে দুটি রহস্যময় বিষয়—সময় এবং ডাইমেনশন বা মাত্রা। কিন্তু অবাক করার মতো বিষয় হলো, এই দুটি বিষয়কে বুঝতে গেলেই আমাদের পরিচিত পৃথিবী সম্পর্কে প্রচলিত অনেক ধারণা নতুন করে ভাবতে হয়।

আমরা প্রতিদিন ঘড়ির কাঁটা দেখি, ক্যালেন্ডারের পাতা উল্টাই। আমাদের কাছে সময় মানে অতীত থেকে বর্তমান হয়ে ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে চলা একটি ধারাবাহিকতা। কিন্তু আধুনিক পদার্থবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে সময় কেবল ঘড়ির কাঁটার চলাচল নয়। বরং মহাবিশ্বের স্থান বা স্পেসের সঙ্গে সময় এমনভাবে জড়িয়ে আছে যে, একটিকে বাদ দিয়ে অন্যটিকে সম্পূর্ণভাবে ব্যাখ্যা করা যায় না। বিজ্ঞানীরা এই সমন্বিত কাঠামোর নাম দিয়েছেন স্পেস-টাইম।

ডাইমেনশন আসলে কী?

বিষয়টি সহজে বুঝতে একটি উদাহরণ দেওয়া যাক। কল্পনা করুন, একটি কাগজের ওপর বসবাস করছে দ্বিমাত্রিক বা 2D জগতের একটি পিঁপড়া। তার কাছে রয়েছে শুধু দৈর্ঘ্য ও প্রস্থ। সে সামনে-পেছনে এবং ডানে-বাঁয়ে চলাচল করতে পারে। কিন্তু উচ্চতা বা ওপর-নিচের ধারণা তার জগতের অংশ নয়।

এবার সেই কাগজের ওপর একজন ত্রিমাত্রিক মানুষ আঙুল রাখল। পিঁপড়াটির কাছে মনে হতে পারে, কোনো অজানা জায়গা থেকে হঠাৎ একটি বস্তু তার জগতে আবির্ভূত হয়েছে। অথচ মানুষটি জানে, সে কেবল তৃতীয় মাত্রা ব্যবহার করে কাগজের জগতের সঙ্গে যোগাযোগ করছে।

এই উদাহরণটি আমাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বোঝায়—কোনো উচ্চতর মাত্রার অস্তিত্ব কল্পনা করতে না পারলেও তার প্রভাব উপলব্ধি করা সম্ভব।

আমরা মানুষ দৈর্ঘ্য, প্রস্থ ও উচ্চতা—এই তিনটি স্থানিক মাত্রায় বসবাস করি। এর সঙ্গে সময়কে যুক্ত করলে তৈরি হয় চার-মাত্রিক স্পেস-টাইম। অর্থাৎ কোনো ঘটনা কোথায় ঘটেছে, তা বোঝার পাশাপাশি কখন ঘটেছে, সেটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

সময় কেন একমুখী?

আমাদের জীবনে সময়কে সবসময় সামনের দিকে এগিয়ে যেতে দেখা যায়। আমরা অতীতে ফিরে যেতে পারি না। একটি কাঁচের গ্লাস মেঝেতে পড়ে ভেঙে গেলে সেটি নিজে থেকে আবার আগের অবস্থায় ফিরে আসে না।

পদার্থবিজ্ঞানে এই বিষয়টি বোঝাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে থার্মোডাইনামিক্সের দ্বিতীয় সূত্র। এই সূত্র অনুযায়ী, একটি বিচ্ছিন্ন ব্যবস্থায় মোট এনট্রপি বা বিশৃঙ্খলার পরিমাপ সাধারণত কমে না; বরং বৃদ্ধি পায়। এ কারণেই ভাঙা গ্লাস নিজে থেকে আগের অবস্থায় ফিরে আসার মতো ঘটনা আমাদের বাস্তব জগতে দেখা যায় না।

এই প্রবণতার সঙ্গে সময়ের একমুখী প্রবাহের একটি গভীর সম্পর্ক রয়েছে। বিজ্ঞানীরা একে বলেন 'অ্যারো অব টাইম' বা সময়ের তীর।

অর্থাৎ আমরা শুধু সময়ের মধ্যে অবস্থান করছি না; বরং মহাবিশ্বের এমন একটি প্রক্রিয়ার অংশ, যেখানে অতীত ও ভবিষ্যতের মধ্যে একটি নির্দিষ্ট পার্থক্য তৈরি হয়।

চতুর্থ মাত্রায় সময়কে কেমন দেখাবে?

এবার আসা যাক আরও বিস্ময়কর একটি ধারণায়—ব্লক ইউনিভার্স থিওরি।

এই ধারণা অনুযায়ী, অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎকে স্পেস-টাইমের একটি বৃহৎ কাঠামোর বিভিন্ন অংশ হিসেবে কল্পনা করা যায়। অর্থাৎ আমাদের কাছে যেসব ঘটনা ধারাবাহিকভাবে ঘটছে, সেগুলোকে চার-মাত্রিক স্পেস-টাইমের একটি পূর্ণাঙ্গ কাঠামোর অংশ হিসেবে বিবেচনা করা সম্ভব।

বিষয়টি একটি সিনেমার উদাহরণ দিয়ে বোঝা যায়। আমরা যখন সিনেমা দেখি, তখন একের পর এক দৃশ্য আমাদের সামনে আসে। কিন্তু সিনেমার সম্পূর্ণ রিল বা ফাইলের মধ্যে শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত সব দৃশ্যই সংরক্ষিত থাকে।

একইভাবে ব্লক ইউনিভার্সের ধারণায় ১৯২০, ২০২৪ কিংবা ২০৫০ সালের ঘটনাগুলোকে স্পেস-টাইমের বিভিন্ন অবস্থান হিসেবে কল্পনা করা যায়।

তাহলে কি উচ্চতর মাত্রার কোনো সত্তা অতীত ও ভবিষ্যৎ একই সঙ্গে দেখতে পারবে? এটি একটি আকর্ষণীয় কল্পনা ও দার্শনিক প্রশ্ন। তবে উচ্চতর মাত্রার কোনো প্রাণী বাস্তবে এমনভাবে সময় ভ্রমণ করতে পারে, এমন বৈজ্ঞানিক প্রমাণ এখনো পাওয়া যায়নি।

আইনস্টাইন দেখিয়েছেন, সবার জন্য সময় এক নয়!

একসময় বিজ্ঞানীরা মনে করতেন, মহাবিশ্বের সব জায়গায় সময় একই গতিতে প্রবাহিত হয়। কিন্তু আলবার্ট আইনস্টাইনের আপেক্ষিকতার তত্ত্ব সেই ধারণা বদলে দেয়।

আইনস্টাইনের তত্ত্ব অনুযায়ী, কোনো বস্তুর গতি এবং তার অবস্থানের মহাকর্ষীয় ক্ষেত্রের ওপর সময়ের প্রবাহ নির্ভর করতে পারে। বিশেষ করে প্রবল মহাকর্ষীয় ক্ষেত্রের কাছাকাছি ঘড়ি তুলনামূলক দুর্বল মহাকর্ষীয় ক্ষেত্রের ঘড়ির চেয়ে ধীরে চলে।

ধরুন, একজন নভোচারী কোনো কৃষ্ণগহ্বরের কাছাকাছি এমন একটি অবস্থানে অবস্থান করছেন, যেখানে মহাকর্ষীয় প্রভাব অত্যন্ত শক্তিশালী। অন্যদিকে পৃথিবীতে রয়েছেন তাঁর একজন পরিচিত ব্যক্তি। নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে নভোচারীর কাছে এক ঘণ্টা অতিবাহিত হলেও পৃথিবীতে তার চেয়ে অনেক বেশি সময় পার হয়ে যেতে পারে।

এটি নিছক কল্পবিজ্ঞান নয়। মহাকর্ষীয় সময় প্রসারণ বা গ্র্যাভিটেশনাল টাইম ডাইলেশন পদার্থবিজ্ঞানের প্রতিষ্ঠিত বিষয়।

এমনকি এ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ভবিষ্যতের দিকে সময় ভ্রমণের একটি বৈজ্ঞানিক ভিত্তিও রয়েছে। তবে অতীতে ফিরে যাওয়ার মতো টাইম ট্রাভেল এখনো প্রমাণিত নয়।

ধর্মীয় বিশ্বাসে সময়ের ভিন্ন মাত্রা

সময় নিয়ে বৈজ্ঞানিক আলোচনার পাশাপাশি ধর্মীয় গ্রন্থেও সময়ের বিশাল পার্থক্য সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ বর্ণনা পাওয়া যায়।

পবিত্র কোরআনের সূরা আল-মাআরিজের ৪ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, ফেরেশতারা এবং রূহ এমন এক দিনে আল্লাহর দিকে আরোহণ করে, যার পরিমাণ পঞ্চাশ হাজার বছর।

এই আয়াত আমাদের সামনে সময়ের বিশালত্ব ও মানবিক উপলব্ধির সীমাবদ্ধতা নিয়ে ভাবনার সুযোগ তৈরি করে। তবে আয়াতটির ব্যাখ্যাকে সরাসরি আইনস্টাইনের টাইম ডাইলেশন কিংবা 4D ডাইমেনশনের বৈজ্ঞানিক প্রমাণ হিসেবে উপস্থাপন করা সঠিক হবে না। ধর্মীয় বর্ণনার নিজস্ব তাৎপর্য রয়েছে, আর বৈজ্ঞানিক তত্ত্বের রয়েছে নিজস্ব পরীক্ষণ ও প্রমাণের কাঠামো।

একইভাবে ফেরেশতারা 4D সত্তা কি না, কিংবা তাঁরা সময়ের বাইরে অবস্থান করেন কি না—এ বিষয়ে নিশ্চিত কোনো বৈজ্ঞানিক সিদ্ধান্ত নেই। এসব বিষয়ে প্রকৃত জ্ঞান একমাত্র আল্লাহর কাছেই রয়েছে।

তাহলে সময়ের স্রষ্টার অবস্থান কোথায়?

এখানে এসে আলোচনাটি পদার্থবিজ্ঞানের গণ্ডি ছাড়িয়ে দর্শন ও ধর্মতত্ত্বের দিকে এগিয়ে যায়।

আমরা যে মহাবিশ্বে বাস করি, তার স্থান, সময়, পদার্থ ও শক্তি—সবকিছুই আমাদের অস্তিত্বের সঙ্গে সম্পর্কিত। ইসলামি বিশ্বাস অনুযায়ী, আল্লাহ সমগ্র সৃষ্টি জগতের স্রষ্টা। তিনি সৃষ্টির মতো সময় ও স্থানের সীমাবদ্ধতার অধীন নন।

মানুষ অতীতের স্মৃতি ধারণ করে, বর্তমানকে অনুভব করে এবং ভবিষ্যৎ সম্পর্কে অনুমান করে। কিন্তু আল্লাহর জ্ঞান সম্পর্কে ইসলামের বিশ্বাস হলো, তাঁর কাছে কোনো কিছুই অজানা নয়। মহাবিশ্বের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত সবকিছুই তাঁর জ্ঞানের অন্তর্ভুক্ত।

এটি কোনো পদার্থবৈজ্ঞানিক ডাইমেনশন তত্ত্ব নয়; বরং স্রষ্টা ও সৃষ্টি সম্পর্কে একটি ধর্মীয় বিশ্বাস।

টাইম ট্রাভেল কি তাহলে অসম্ভব?

সব মিলিয়ে বলা যায়, সময় আমাদের দৈনন্দিন অভিজ্ঞতার চেয়ে অনেক বেশি জটিল। আইনস্টাইনের আপেক্ষিকতা দেখিয়েছে, সময় সবার জন্য একই গতিতে চলে না। আবার ব্লক ইউনিভার্সের মতো তত্ত্ব ও দার্শনিক ধারণা অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ সম্পর্কে আমাদের প্রচলিত চিন্তাকে নতুনভাবে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে।

ভবিষ্যতের দিকে সময় ভ্রমণ পদার্থবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে সম্ভব এবং এর বাস্তব ভিত্তিও রয়েছে। কিন্তু অতীতে ফিরে যাওয়া কিংবা ইচ্ছামতো সময়ের প্রবাহ পরিবর্তন করার প্রযুক্তি এখনো মানুষের আয়ত্তে আসেনি।

হয়তো মহাবিশ্বের সবচেয়ে বড় রহস্যগুলোর একটি এখনো আমাদের অজানা। আমরা যে সময়কে ঘড়ির কাঁটায় মাপি, সেটিই হয়তো বাস্তবতার আরও বিশাল একটি কাঠামোর অংশ।

আর সেই কাঠামোর সম্পূর্ণ রহস্য উন্মোচন করতে মানবজাতিকে আরও অনেক দূর এগোতে হবে।

বিশেষ দ্রষ্টব্য: এই প্রতিবেদনে আলোচিত ব্লক ইউনিভার্স, উচ্চতর মাত্রা ও টাইম ট্রাভেলের কিছু বিষয় বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব, অনুমান ও দার্শনিক ধারণার ভিত্তিতে উপস্থাপিত। এগুলোকে প্রতিষ্ঠিত বৈজ্ঞানিক সত্য হিসেবে বিবেচনা করা উচিত নয়। ধর্মীয় বিষয়গুলোর ক্ষেত্রেও প্রচলিত ব্যাখ্যা ও বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যার পার্থক্য বজায় রাখা হয়েছে।