দীর্ঘদিন ধরে আমাজনকে প্রায় জনবসতিহীন ঘন বনাঞ্চল হিসেবে বিবেচনা করা হলেও নতুন এক গবেষণা সেই ধারণায় বড় পরিবর্তন আনছে। ব্রাজিলের আমাজন জঙ্গলের গভীরে লেজার প্রযুক্তির সাহায্যে শত শত প্রাচীন মাটির স্থাপনা শনাক্ত করেছেন গবেষকরা। তাঁদের ধারণা, এসব স্থাপনা গড়ে তুলেছিল এমন এক সভ্যতা, যেখানে একসময় প্রায় ৩০ লাখ মানুষের বসবাস ছিল।
গবেষণাটি প্রকাশিত হয়েছে বিজ্ঞান সাময়িকী ‘নেচার’-এ। স্পেন, ফিনল্যান্ড, ব্রাজিল ও ডেনমার্কের গবেষকদের সমন্বয়ে পরিচালিত এই অনুসন্ধানে ব্যবহার করা হয়েছে লাইডার (LiDAR) প্রযুক্তি। লেজার রশ্মির মাধ্যমে ভূমির ত্রিমাত্রিক মানচিত্র তৈরি করে এই প্রযুক্তি। ফলে ঘন জঙ্গলের গাছপালা না কেটেই মাটির নিচে ও আড়ালে থাকা প্রাচীন কাঠামোর অবস্থান শনাক্ত করা সম্ভব হয়েছে।
প্রায় ৪ হাজার ৪০০ বর্গকিলোমিটার এলাকাজুড়ে জরিপ চালিয়ে গবেষকরা ৪৩২টি জিওগ্লিফ বা বিশালাকৃতির মাটির নকশা ও কাঠামো খুঁজে পেয়েছেন। এগুলোর অধিকাংশই আগে নথিভুক্ত ছিল না। ধারণা করা হচ্ছে, স্থাপনাগুলো ৬০০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দ থেকে ৮৫০ খ্রিষ্টাব্দের মধ্যে নির্মিত হয়েছিল।
গবেষকদের অনুমান, এসব স্থাপনা নির্মাণকারী অ্যাকুইরি সভ্যতা প্রায় ১ লাখ ৮৩ হাজার বর্গকিলোমিটার এলাকাজুড়ে বিস্তৃত ছিল। ১০০ থেকে ৩০০ খ্রিষ্টাব্দের মধ্যে সভ্যতাটির সর্বোচ্চ বিকাশের সময় জনসংখ্যা প্রায় ৩০ লাখে পৌঁছাতে পারে।
কীভাবে গড়ে উঠেছিল এত বিশাল স্থাপনা?
গবেষণায় ১৫ মিটার পর্যন্ত প্রশস্ত এবং পাঁচ মিটার গভীর মাটির নালা ও বিভিন্ন জ্যামিতিক কাঠামোর সন্ধান পাওয়া গেছে। গবেষকদের মতে, এত বড় স্থাপনা নির্মাণে বিপুলসংখ্যক মানুষের সম্মিলিত শ্রম, পরিকল্পনা এবং জ্যামিতিক জ্ঞানের প্রয়োজন হয়েছিল। পাথরের অভাব থাকায় তাঁরা কাঠের সরঞ্জাম ও ঝুড়ির সাহায্যে মাটি সরিয়ে এসব কাঠামো তৈরি করে থাকতে পারেন।
কী কাজে ব্যবহার হতো এসব স্থাপনা?
প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হতো, জিওগ্লিফগুলো প্রতিরক্ষামূলক দুর্গ হিসেবে ব্যবহৃত হতো। তবে নতুন গবেষণায় ইঙ্গিত মিলেছে, এগুলো মূলত ধর্মীয় অনুষ্ঠান, রাজনৈতিক কার্যক্রম এবং সামাজিক সমাবেশের কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে থাকতে পারে।
গবেষকরা আরও প্রায় ৩৫০ কিলোমিটার দীর্ঘ প্রাচীন রাস্তার সন্ধান পেয়েছেন, যেগুলো বিভিন্ন জিওগ্লিফকে একে অপরের সঙ্গে যুক্ত করেছিল। স্থাপনাগুলোর কাছাকাছি যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে এসব রাস্তা আরও প্রশস্ত হয়েছে। এতে বোঝা যায়, এগুলো বিচ্ছিন্ন কোনো স্থাপনা ছিল না; বরং একটি সুসংগঠিত যোগাযোগব্যবস্থার অংশ ছিল।
প্রকৃতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ জীবনযাপন
গবেষকদের মতে, প্রাচীন এই জনগোষ্ঠী আমাজনের বন পুরোপুরি উজাড় না করে প্রয়োজন অনুযায়ী সীমিত এলাকায় কৃষিকাজ করত। ভুট্টা, স্কোয়াশ ও ম্যানিওকের মতো ফসল উৎপাদনের জন্য তারা বনভূমির কিছু অংশ ব্যবহার করত। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে স্থাপনাগুলো রক্ষণাবেক্ষণের বিষয়টিও তাদের সংগঠিত সামাজিক ব্যবস্থা ও সঞ্চিত জ্ঞানের পরিচয় বহন করে।
কেন হারিয়ে গেল এই সভ্যতা?
গবেষণায় দেখা গেছে, আনুমানিক ৮৫০ খ্রিষ্টাব্দের পর এসব জিওগ্লিফ নির্মাণ বন্ধ হয়ে যায়। তবে এর সুনির্দিষ্ট কারণ এখনো জানা যায়নি। গবেষকরা ধারণা করছেন, নবম শতাব্দীতে কোনো বড় পরিবেশগত পরিবর্তন বা সংকট এর পেছনে ভূমিকা রাখতে পারে। একই সময়ের কাছাকাছি মধ্য আমেরিকার মায়া সভ্যতার গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রগুলোও পরিত্যক্ত হতে শুরু করেছিল।
নতুন এই আবিষ্কার আমাজনের প্রাচীন জনবসতি সম্পর্কে প্রচলিত ধারণাকে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করছে। আগে মনে করা হতো, আমাজনের অধিকাংশ মানুষ বড় নদীর তীরবর্তী এলাকায় বসবাস করত। কিন্তু নতুন গবেষণা বলছে, নদী থেকে দূরের উঁচু এলাকাতেও ছিল বড় বড় বসতি, কৃষিকাজ ও যোগাযোগব্যবস্থা।
গবেষকদের মতে, ইউরোপীয়দের আগমনের বহু আগে থেকেই আমাজনে লাখ লাখ মানুষের বসবাস ছিল। তাঁরা শুধু বনাঞ্চলে বসতি গড়েননি, বরং কৃষি, স্থাপত্য ও যোগাযোগব্যবস্থার মাধ্যমে পুরো অঞ্চলের ভূপ্রকৃতিতেও দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব রেখেছেন।
সব মিলিয়ে, লাইডার প্রযুক্তির এই আবিষ্কার প্রমাণ করছে, আমাজন কেবল প্রাকৃতিক বনভূমি ছিল না; এর গভীরে লুকিয়ে রয়েছে মানুষের সুদীর্ঘ ইতিহাস, উন্নত পরিকল্পনা এবং এক বিস্মৃত সভ্যতার অসাধারণ নিদর্শন।