দেশের শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত জুনে হিসাব বছর শেষ হওয়া কোম্পানিগুলোর লভ্যাংশ ঘোষণার মৌসুম শেষ হয়েছে। ২০২৫-২৬ হিসাব বছরের আর্থিক ফলাফলের ভিত্তিতে ১০২টি কোম্পানি শেয়ারহোল্ডারদের জন্য মোট ৪ হাজার ৩৩৫ কোটি ৫২ লাখ টাকার লভ্যাংশ ঘোষণা করেছে। এ অর্থের অংশ পাবেন সাধারণ বিনিয়োগকারীদের পাশাপাশি প্রাতিষ্ঠানিক ও বিদেশি বিনিয়োগকারী এবং উদ্যোক্তা-পরিচালকেরাও।

ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) ওয়েবসাইটে গত বৃহস্পতিবার পর্যন্ত প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, লভ্যাংশ ঘোষণা করা ১০২টি কোম্পানির মধ্যে মাত্র পাঁচটি স্টক বা বোনাস লভ্যাংশ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এসব কোম্পানির বোনাস লভ্যাংশের আর্থিক মূল্য প্রায় ৬৯ কোটি টাকা। এতে নগদ লভ্যাংশ দেওয়ার প্রবণতাই বেশি দেখা যাচ্ছে।

অন্যদিকে, ব্যবসায়িক মন্দা, তহবিল সংকট ও নিট লোকসানের কারণে ২৮টি কোম্পানি এ বছর কোনো লভ্যাংশ না দেওয়ার সিদ্ধান্ত জানিয়েছে। এ ছাড়া ১১৪টি কোম্পানি নির্ধারিত সময়ের মধ্যে লভ্যাংশের ঘোষণা দেয়নি, এমনকি পরিচালনা পর্ষদের সভাও করেনি। এসব প্রতিষ্ঠানের অধিকাংশই লোকসানি, রুগ্‌ণ কিংবা বন্ধ। ডিএসইর সরেজমিন পরিদর্শনে অন্তত ৩৭টি কোম্পানির ব্যবসা বা উৎপাদন কার্যক্রম পুরোপুরি বন্ধ থাকার তথ্য উঠে এসেছে।

লভ্যাংশ ঘোষণাকারী কোম্পানিগুলোর মুনাফা

১০২টি লভ্যাংশ ঘোষণাকারী কোম্পানির আর্থিক প্রতিবেদন বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০২৫-২৬ হিসাব বছরে প্রতিষ্ঠানগুলো সম্মিলিতভাবে ১১ হাজার ৭৪২ কোটি টাকা নিট মুনাফা করেছে। এর বিপরীতে শেয়ারহোল্ডারদের মধ্যে ৪ হাজার ৩৩৫ কোটি ৫২ লাখ টাকা বিতরণের সুপারিশ করা হয়েছে। অর্থাৎ অর্জিত নিট মুনাফার প্রায় ৩৬ দশমিক ৯২ শতাংশ লভ্যাংশ হিসেবে বণ্টন করা হবে।

তবে লভ্যাংশ ঘোষণাকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে ১২টি কোম্পানি গত হিসাব বছরে লোকসান করেছে। তারপরও আগের বছরগুলোর জমা মুনাফা থেকে তারা শেয়ারহোল্ডারদের জন্য লভ্যাংশ ঘোষণা করেছে। এর মধ্যে এসিআই লিমিটেড ৭৫ কোটি টাকার বেশি নিট লোকসান করেও ১৫ শতাংশ নগদ ও ৫ শতাংশ বোনাস লভ্যাংশ দেওয়ার সুপারিশ করেছে।

খাতভিত্তিক হিসাবে ওষুধ ও রসায়ন, প্রকৌশল, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি এবং বহুজাতিক কোম্পানিগুলো মুনাফা ও নগদ লভ্যাংশ প্রদানে এগিয়ে রয়েছে। একক কোম্পানি হিসেবে নিট মুনাফা ও নগদ লভ্যাংশ—দুই ক্ষেত্রেই শীর্ষে রয়েছে স্কয়ার ফার্মাসিউটিক্যালস। প্রতিষ্ঠানটি গত হিসাব বছরে ২ হাজার ৭৬৯ কোটি টাকা নিট মুনাফা করেছে। শেয়ারহোল্ডারদের জন্য ১৩০ শতাংশ নগদ লভ্যাংশ ঘোষণা করেছে, যার আর্থিক মূল্য ১ হাজার ১৫২ কোটি টাকা।

প্রকৌশল খাতের ওয়ালটন হাই-টেক ১ হাজার ২৩৭ কোটি টাকা নিট মুনাফার বিপরীতে ১৮০ শতাংশ নগদ ও ১০ শতাংশ বোনাস লভ্যাংশ ঘোষণা করেছে। কোম্পানিটির মোট লভ্যাংশের পরিমাণ ৬৯৬ কোটি টাকা। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের ইউনাইটেড পাওয়ার ৯২৪ কোটি ৩ লাখ টাকা নিট মুনাফা করে ৬০ শতাংশ নগদ লভ্যাংশ হিসেবে ৩৪৭ কোটি ৮২ লাখ টাকা দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে।

ওষুধ খাতের বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যালস ৮৯৯ কোটি ৮১ লাখ টাকা নিট মুনাফার বিপরীতে ৬০ শতাংশ নগদ লভ্যাংশ হিসেবে ২৬৭ কোটি ৬৭ লাখ টাকা দেওয়ার সুপারিশ করেছে। একই খাতের রেনাটা লিমিটেড ৩৬৪ কোটি ২৮ লাখ টাকা মুনাফা করে ৬৩ কোটি ৮ লাখ টাকা নগদ লভ্যাংশ ঘোষণার প্রস্তাব দিয়েছে।

এ ছাড়া ইস্পাত খাতের বিএসআরএম স্টিল ২২৫ কোটি ৫৭ লাখ টাকা এবং বিএসআরএম লিমিটেড ১৬৪ কোটি ২২ লাখ টাকার নগদ লভ্যাংশ ঘোষণা করেছে। শতাংশের হিসাবে উল্লেখযোগ্য লভ্যাংশ দেওয়া অন্য প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে রয়েছে ইবনে সিনা, মতিন স্পিনিং, এমজেএল বাংলাদেশ, সামিট পাওয়ার, বাংলাদেশ সাবমেরিন কেবল ও এসিআই ফর্মুলা।

লোকসান করেও লভ্যাংশ দিচ্ছে ১২ কোম্পানি

ব্যবসায়িক মন্দা ও নিট লোকসানের মধ্যেও শেয়ারহোল্ডারদের লভ্যাংশ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে ১২টি কোম্পানি। আগের বছরগুলোর পুঞ্জীভূত মুনাফা ব্যবহার করে কিংবা তালিকাভুক্তির ক্যাটাগরি ধরে রাখার বিবেচনায় প্রতিষ্ঠানগুলো এ সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

এ তালিকায় রয়েছে এসিআই লিমিটেড। সমাপ্ত হিসাব বছরে কোম্পানিটির শেয়ারপ্রতি লোকসান হয়েছে ৮ টাকা ৫৯ পয়সা। এরপরও ১৫ শতাংশ নগদ ও ৫ শতাংশ স্টক লভ্যাংশ দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। একইভাবে শেয়ারপ্রতি ৬ টাকা ২ পয়সা লোকসান সত্ত্বেও তিতাস গ্যাস ২ শতাংশ নগদ লভ্যাংশ ঘোষণা করেছে।