বাংলাদেশে মোট মৃত্যুর প্রায় ৭১ শতাংশের জন্য দায়ী অসংক্রামক রোগ। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) তথ্য অনুযায়ী, স্ট্রোক, ডায়াবেটিস, হৃদরোগ, দীর্ঘস্থায়ী শ্বাসতন্ত্রের রোগ, ক্যান্সার ও কিডনি জটিলতায় দেশে মৃত্যুর হার ক্রমেই বাড়ছে। এসব মৃত্যুর একটি বড় অংশই অকালমৃত্যু, যার প্রায় ৮২ শতাংশ ঘটে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোতে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, একসময় বয়স্কদের রোগ হিসেবে পরিচিত এসব অসুস্থতা এখন তরুণদেরও ঝুঁকিতে ফেলছে। জীবনযাত্রার পরিবর্তন, অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস, তামাক ব্যবহার, বায়ুদূষণ ও শারীরিক পরিশ্রমের অভাব এর অন্যতম কারণ। এমনকি আপাতদৃষ্টিতে সুস্থ মানুষও হঠাৎ হৃদরোগ বা স্ট্রোকে আক্রান্ত হয়ে মারা যাচ্ছেন।
হৃদরোগ ও হার্ট অ্যাটাক
বাংলাদেশে হৃদরোগ, বিশেষ করে করোনারি আর্টারি ডিজিজের প্রকোপ উদ্বেগজনকভাবে বাড়ছে। পাশাপাশি উচ্চ রক্তচাপ ও হার্ট ফেইলিউরের ঝুঁকিও বৃদ্ধি পাচ্ছে। হৃদযন্ত্রে রক্ত সরবরাহকারী ধমনি বন্ধ হয়ে গেলে অক্সিজেনের অভাবে হার্ট অ্যাটাক হতে পারে। বুকে চাপ বা ব্যথা, বাম হাত ও ঘাড়ে ব্যথা ছড়িয়ে পড়া, শ্বাসকষ্ট, অতিরিক্ত ঘাম ও বমি বমি ভাব এর উল্লেখযোগ্য লক্ষণ। এসব উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত জরুরি চিকিৎসা নেওয়া প্রয়োজন।
স্ট্রোক: সময়ই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ
স্ট্রোক ও হার্ট অ্যাটাক এক নয়। মস্তিষ্কে রক্ত সরবরাহ বাধাগ্রস্ত হলে অথবা রক্তনালি ছিঁড়ে রক্তক্ষরণ হলে স্ট্রোক হতে পারে। সাধারণ লক্ষণের মধ্যে রয়েছে শরীরের এক পাশ অবশ হয়ে যাওয়া, কথা জড়িয়ে যাওয়া, মুখ বেঁকে যাওয়া, চোখে ঝাপসা দেখা ও ভারসাম্য হারানো। আগে বয়স্কদের মধ্যে বেশি দেখা গেলেও বর্তমানে তরুণদের মধ্যেও এর ঝুঁকি বাড়ছে। চিকিৎসকদের মতে, স্ট্রোকের ক্ষেত্রে দ্রুত হাসপাতালে নেওয়া গেলে মস্তিষ্কের ক্ষতি ও মৃত্যুঝুঁকি অনেকটাই কমানো সম্ভব।
ডায়াবেটিসে বাড়ছে আক্রান্তের সংখ্যা
আন্তর্জাতিক ডায়াবেটিস ফেডারেশনের (আইডিএফ) তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে প্রাপ্তবয়স্ক ডায়াবেটিস রোগীর সংখ্যা ১ কোটি ৩৮ লাখের বেশি। রোগীর সংখ্যার দিক থেকে বিশ্বে বাংলাদেশের অবস্থান অষ্টম। সংস্থাটির পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০৪৫ সালের মধ্যে আক্রান্তের সংখ্যা বেড়ে ২ কোটি ২৩ লাখে পৌঁছাতে পারে। উদ্বেগের বিষয়, দেশের প্রায় ৪৩ শতাংশ ডায়াবেটিস আক্রান্ত ব্যক্তি জানেনই না যে তাঁরা এই রোগে ভুগছেন। অতিরিক্ত ওজন, স্থূলতা ও উচ্চ রক্তচাপ টাইপ-২ ডায়াবেটিসের ঝুঁকি বাড়ায়।
দীর্ঘস্থায়ী শ্বাসতন্ত্রের রোগ
হাঁপানি ও ক্রনিক অবস্ট্রাকটিভ পালমোনারি ডিজিজের (সিওপিডি) মতো রোগ বাংলাদেশে জনস্বাস্থ্যের জন্য বড় উদ্বেগ হয়ে উঠেছে। গবেষণায় দেখা গেছে, প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ আক্রান্ত ব্যক্তি জানেন না যে তাঁরা দীর্ঘস্থায়ী ফুসফুসের সমস্যায় ভুগছেন। ধূমপান, বায়ুদূষণ এবং রান্নায় কাঠ, গোবর ও অন্যান্য জৈব জ্বালানির ধোঁয়া এসব রোগের ঝুঁকি বাড়ায়। গ্রামাঞ্চলে এ ধরনের রোগের প্রকোপ তুলনামূলক বেশি।
ক্যান্সারেও বাড়ছে মৃত্যুর সংখ্যা
বাংলাদেশে মৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ ক্যান্সার। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসাব অনুযায়ী, দেশে প্রতিবছর ১ লাখ ৬৭ হাজারের বেশি মানুষ নতুন করে ক্যান্সারে আক্রান্ত হন এবং ১ লাখ ১৬ হাজারের বেশি মানুষের মৃত্যু হয়। পুরুষদের মধ্যে ফুসফুস ও মুখগহ্বরের ক্যান্সার এবং নারীদের মধ্যে স্তন ও জরায়ুমুখের ক্যান্সার বেশি দেখা যায়। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেরিতে রোগ শনাক্ত হওয়া এবং চিকিৎসাসেবা গ্রহণে বিলম্ব মৃত্যুঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়।
প্রতিরোধে প্রয়োজন সচেতনতা ও দ্রুত চিকিৎসা
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, অসংক্রামক রোগজনিত অকালমৃত্যু কমাতে তিনটি বিষয় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ—রোগ প্রতিরোধ, প্রাথমিক পর্যায়ে শনাক্তকরণ এবং জরুরি চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করা। শৈশব থেকেই স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন, সুষম খাদ্যাভ্যাস, নিয়মিত শারীরিক পরিশ্রম এবং তামাক পরিহারের পাশাপাশি নিয়মিত রক্তচাপ, রক্তে শর্করা ও প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা জরুরি।
সব মিলিয়ে, অসংক্রামক রোগ এখন বাংলাদেশের জনস্বাস্থ্যের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ। সময়মতো রোগ শনাক্ত, সচেতনতা বৃদ্ধি এবং সহজলভ্য জরুরি চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করা না গেলে অকালমৃত্যুর এই ঝুঁকি আরও বাড়তে পারে।