হাঁস-মুরগি পালন ও সেলাইসহ নানা ধরনের কাজ, প্রশিক্ষণ এবং সরকারি অনুদানের মাধ্যমে গ্রামীণ অসহায় ও দরিদ্রসহ বিভিন্ন শ্রেণির নারীরা স্বাবলম্বী হয়ে উঠছেন। এরই ধারাবাহিকতায় ভেড়া পালন করে সংসার থেকে অভাব দূর করে স্বচ্ছলতার নজির সৃষ্টি করেছেন নওগাঁ শহরের খলিসাকুড়ি ডাঙ্গাপাড়ার নারী উদ্যোক্তা শুকলেমা খাতুন। তার এ উদ্যোগ এলাকায় অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছে। অনেকেই আগ্রহ প্রকাশ করেছেন তার মত ভেড়ার খামার গড়ার।

জেলা শহরের খলিসাকুড়ি ডাঙ্গাপাড়া মহল্লার শুকলেমা খাতুনের স্বামী, ২ ছেলে ১ মেয়েসহ মোট চার জনের অভাবের সংসার। স্বামী তেমন কিছু করেন না। ভ্যানে ফেরী করে ফল বিক্রি করে কোন রকমে দিন যাপন করতেন তারা।

শুকলেমা খাতুন বাসসকে বলেন, এখন থেকে দেড় বছর আগে বাড়িতে স্বল্প পরিসরে ভেড়া পালন শুরু করেন।

প্রথমে ৬টি ভেড়া দিয়ে খামার শুরু করেন। কিন্তু এ স্বল্প পরিসরে ভেড়া পালন করতে গিয়ে দেখেন নজরদারির অভাবে অনেক সময় কুকুরে কামড়ে আহত করে ভেড়াগুলোকে। এর পরিপ্রেক্ষিতে তিনি বেশি করে ভেড়া পালনের সিদ্ধান্ত নেন। যেই ভাবা সেই কাজ। আর তখন থেকেই বিভিন্ন সমিতি থেকে ২ লাখ ৩০ হাজার টাকা ঋণ নিয়ে ছোট বড় ৪২টা ভেড়া ক্রয় করেন। ভেড়াগুলোকে কাছে থেকে সরাসরি অধিক গুরুত্ব দিয়ে চড়ানোর প্রয়োজনীয়তা অনুভব করে ব্যক্তিগত নজরদারির ওপর গুরুত্ব দেন। সেই তাগিদ থেকেই ভেড়াগুলো মাঠে চড়িয়ে ঘাস খাওয়ানো হয়। আর এতে আলাদা করে ভেড়ার কোন খাদ্যের জন্য খরচের প্রয়োজন হয় না।

তিনি আরও জানান, গত দেড় বছরের মধ্যে গেল কোরবানীর সময় ১ লাখ ৭৫ হাজার টাকায় ১৮টি খাসি ভেড়া বিক্রি করেছেন। বর্তমানে ছোট বড় মিলিয়ে তার খামারে ৭০টি ভেড়া আছে। এরইমধ্যে আগামী কোরবানীর জন্য প্রস্তুত হচ্ছে ২৫টি  ভেড়া। প্রতিটি গড়ে ১২ হাজার টাকা করে মোট ৩ লাখ টাকার ভেড়া বিক্রি করবেন বলে আশা করছেন তিনি।

দেড় বছরের মধ্যে তিনি সব খরচ বাদ দিয়ে ২ লাখ ৪৫ হাজার টাকা নীট লাভের প্রত্যাশা তার। ইতোমধ্যে তিনি সমিতি থেকে নেয়া সব ঋণ পরিশোধ করতে সক্ষম হয়েছেন।

তিনি জানান, ভেড়ার প্রজননের জন্য একটি পুরুষ গাড়ল রেখেছেন খামারে। কাজেই এখন থেকে ভেড়ার পরবর্তী প্রজন্ম গাড়ল প্রজাতির হবে। সে ক্ষেত্রে আরও লাভবান হওয়ার সম্ভাবনা দেখছেন তিনি।

শুকলেমা খাতুন প্রতিদিন সকাল ৯টার মধ্যে ভেড়াগুলো মাঠে চড়াতে নিয়ে যান। সেগুলো বাড়িতে নিয়ে আসেন বিকেলে। এমনই করেই শুকলেমার প্রতিটি দিন যায়। তার ভেড়ার খামার করে সাফল্যের কথা এলাকায় সর্বজনবিদিত। ভেড়ার কথা আসলেই শুকলেমা খাতুনের নাম উচ্চারিত হয়।

খলিশাকূড়ি গ্রামের যুবক হাকিম মন্ডল, পাশ্ববর্তী বোয়ালিয়া গ্রামের মোক্তার হোসেন এবং জগৎসিংহপুর গ্রামের মনির হোসেন বাসসকে বলেন, শুকলেমার পরিবারে কেবলই অভাব ছিল। তিনবেলা ঠিকমতো খাবার হতো না। কিন্তু ভেড়া পালন করে স্বচ্ছলতা এসেছে। আর কোন অভাব নাই তার সংসারে। বরং ছেলেকে একটা পিক-আপ ভ্যান কিনে দিয়েছেন।

ভেড়ার আয়ের পাশাপাশি এখান থেকেও আয় হচ্ছে।

জেলা প্রাণিসম্পদ অফিসের অতিরিক্ত কর্মকর্তা ডাক্তার গৌরাঙ্গ কুমার তালুকদার বাসসকে বলেন, খলিশাকূড়ি গ্রামের শুকলেমা খাতুনের ভেড়ার খামারের কথা তিনি জানেন। ভেড়া পালন খুবই লাভজনক। প্রতিটি ভেড়া প্রতি ৬ মাস পর পর বাচ্চা দেয়। আবার জন্মের ৬ মাস পর সেও বাচ্চা দেয়ার উপযোগী হয়ে উঠে।

প্রাণিসম্পদ বিভাগ থেকে নিয়মিত তার খামারটি পরিদর্শন করা হয়। কারণ এটি জেলার অন্যতম বৃহৎ ভেড়ার খামার। সম্পূর্ণ বিনামূল্যে ভেড়ার পিপিআর টিকা দেয়া হয়। এছাড়াও প্রয়োজন অনুযায়ী কৃমিনাশক ওষুধ এবং সার্বক্ষণিক পরামর্শ দেয়া হয়। সূত্র : বাসস