রাজনৈতিক দলগুলোর গঠনতন্ত্রে সদস্য হওয়ার ক্ষেত্রে ন্যূনতম নৈতিকতা ও শুদ্ধাচারের শর্ত না থাকায় বিভিন্ন অপরাধে জড়িত ব্যক্তিদের দলে প্রবেশের সুযোগ তৈরি হচ্ছে। চাঁদাবাজি, মানব পাচার, চোরাচালান, অস্ত্র ও মাদক ব্যবসার মতো অপরাধে জড়িত ব্যক্তিরাও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত হওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন। গত পাঁচটি জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নেওয়া ১৮ থেকে ৩২ শতাংশ প্রার্থীর বিরুদ্ধে বিভিন্ন অপরাধে এক বা একাধিক মামলা ছিল।
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) প্রকাশিত ‘বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলের প্রাতিষ্ঠানিক সুশাসন’ শীর্ষক গবেষণা প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে।
রোববার রাজধানীর ধানমন্ডিতে মাইডাস সেন্টারে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে প্রতিবেদনটি প্রকাশ করে টিআইবি।
প্রতিবেদনে ১৮টি রাজনৈতিক দলের গঠনতন্ত্র বিশ্লেষণ করে অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্র, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির ক্ষেত্রে নানা সীমাবদ্ধতা চিহ্নিত করা হয়েছে। এসব ঘাটতির কারণে দলীয় কার্যক্রমে অর্থ ও পেশিশক্তির অধিকারী ব্যক্তিদের প্রভাব বাড়ছে। কালো টাকা, ক্ষমতার অপব্যবহার ও রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়নের ফলে রাজনৈতিক অংশগ্রহণ অনেক ক্ষেত্রে ব্যবসায়িক মডেলে রূপ নিচ্ছে বলে পর্যবেক্ষণে উল্লেখ করা হয়েছে।
নির্বাচনী ব্যয় ও সম্পদ বৃদ্ধির চিত্র
টিআইবির গবেষণায় বলা হয়েছে, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রার্থীরা নির্ধারিত ব্যয়সীমার তুলনায় গড়ে ১৬৯ দশমিক ৫ শতাংশ বেশি অর্থ ব্যয় করেছেন। তবে নির্বাচনী ব্যয়ের ওপর কার্যকর নজরদারি ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে রাজনৈতিক দলগুলোর ভূমিকা ছিল না বললেই চলে।
এ ছাড়া একাদশ জাতীয় সংসদের ৬৭ জন সদস্য এবং তাঁদের পরিবারের ৪৪ জন সদস্যের সম্পদের হিসাব বিশ্লেষণ করেছে সংস্থাটি। এতে দেখা গেছে, পাঁচ বছরের ব্যবধানে তাঁদের সম্পদের পরিমাণ ৫০ শতাংশের বেশি বেড়েছে। একজন সংসদ সদস্যের ব্যক্তিগত সম্পদ সর্বোচ্চ ৫ হাজার ৪৭০ শতাংশ এবং তাঁর পরিবারের সদস্যদের সম্পদ ৩৮ হাজার ৪২৩ শতাংশের বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে।
নারীর অংশগ্রহণ ও জবাবদিহিতে দুর্বলতা
রাজনৈতিক দলগুলোতে নারীর অন্তর্ভুক্তি ও নেতৃত্বের ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি দেখা যায়নি বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তৃণমূল পর্যায়ে গণতান্ত্রিক চর্চা ও অংশগ্রহণের ঘাটতির কারণে পরিবারতন্ত্র, ব্যক্তিকেন্দ্রিক নেতৃত্ব এবং পুরুষতান্ত্রিক প্রবণতা আরও জোরালো হচ্ছে।
এ ছাড়া নির্বাচনী আচরণবিধি লঙ্ঘন, হলফনামায় সম্পদ ও ব্যবসায়িক তথ্য গোপনসহ বিভিন্ন অনিয়মের ঘটনায় রাজনৈতিক দলগুলোর জবাবদিহি নিশ্চিত করার ব্যবস্থাও দুর্বল বলে জানিয়েছে টিআইবি।
সংস্থাটির পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, রাজনৈতিক দলগুলোর অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা, রাজনৈতিক অর্থায়নে স্বচ্ছতা আনা এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় শক্তিশালী আইনগত কাঠামোর অভাব রয়েছে।
টিআইবি মনে করে, গণতন্ত্রের অন্যতম প্রধান প্রতিষ্ঠান হিসেবে রাজনৈতিক দলগুলোর প্রাতিষ্ঠানিক সুশাসন নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। এ জন্য দলগুলোর অভ্যন্তরীণ সংস্কার প্রয়োজন, আর সেই সংস্কারের উদ্যোগ ও দায়িত্ব রাজনৈতিক দলগুলোকেই নিতে হবে।