ন্যূনতম মাসিক মজুরি ৩০ হাজার টাকা নির্ধারণসহ বিভিন্ন দাবিতে ঢাকার সাভার ও গাজীপুরের শিল্পাঞ্চলে বিক্ষোভে নেমেছেন পোশাকশ্রমিকেরা। রোববার সকাল থেকে শুরু হওয়া এই আন্দোলন দুপুরের দিকে আরও ছড়িয়ে পড়ে। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে দুই জেলার অন্তত ৮০টি পোশাক কারখানায় ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে বলে প্রাথমিকভাবে জানা গেছে।
সকালে অধিকাংশ কারখানায় উৎপাদন কার্যক্রম স্বাভাবিক থাকলেও বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সাভারের বিভিন্ন এলাকায় উত্তেজনা বাড়তে থাকে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে শিল্পাঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট ও কারখানার সামনে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়। আশুলিয়া শিল্পাঞ্চল পুলিশ-১-এর পুলিশ সুপার মোহাম্মদ মোমিনুল ইসলাম ভূঁইয়া জানান, শ্রমিক অসন্তোষের কারণে সাভার এলাকায় অর্ধশতাধিক কারখানায় ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে।
প্রত্যক্ষদর্শী ও শিল্প পুলিশ সূত্রে জানা যায়, আশুলিয়ার নিশ্চিতপুর এলাকার আল-মুসলিম অ্যাপারেলস, নিউএইজ গ্রুপ এবং ট্রাউজার লাইন লিমিটেডের শ্রমিকদের একাংশ কাজ বন্ধ রেখে কারখানার ভেতরে অবস্থান করেন। পরে বেলা পৌনে ১১টার দিকে নরসিংহপুর এলাকায় শারমিন গ্রুপের কারখানার সামনে আব্দুল্লাহপুর-বাইপাইল সড়কে কয়েকটি কারখানার শ্রমিকেরা জড়ো হন। এ সময় তাঁরা বেতন বৃদ্ধিসহ বিভিন্ন দাবিতে স্লোগান দেন।
শিল্প পুলিশের পক্ষ থেকে শ্রমিকদের সড়ক ছেড়ে এক পাশে অবস্থান নেওয়ার অনুরোধ জানানো হলে তাঁরা সড়কের পাশে সরে যান। একই সঙ্গে শারমিন গ্রুপের শ্রমিকদেরও আন্দোলনে যোগ দেওয়ার আহ্বান জানান বিক্ষোভকারীরা। পরিস্থিতি বিবেচনায় বেলা পৌনে ১২টার দিকে শারমিন গ্রুপের কারখানায় ছুটি ঘোষণা করে কর্তৃপক্ষ। পরে হা-মীম গ্রুপ, নিউএইজসহ আশপাশের আরও কয়েকটি কারখানায়ও ছুটি দেওয়া হয়।
বাংলাদেশ গার্মেন্টস ও সোয়েটার্স শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্রের আইনবিষয়ক সম্পাদক খায়রুল মামুন জানান, কাজ বন্ধ রেখে কারখানার ভেতরে অবস্থান করা কয়েকজন শ্রমিকের সঙ্গে তাঁর কথা হয়েছে। তাঁদের অভিযোগ, বেতন বৃদ্ধির দাবির বিষয়ে কারখানা কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে স্পষ্ট কোনো বক্তব্য দেওয়া হয়নি। ফলে শ্রমিকদের মধ্যে অনিশ্চয়তা ও অসন্তোষ তৈরি হচ্ছে। তাঁর মতে, ছুটি ঘোষণার পর দাবির বিষয়ে পরিষ্কার তথ্য না পেয়ে কিছু শ্রমিক সড়কে নেমে পড়ছেন এবং অন্য কারখানার শ্রমিকদেরও আন্দোলনে যুক্ত করার চেষ্টা করছেন। এ পরিস্থিতিতে শ্রমিকদের সঙ্গে দ্রুত আলোচনা করে বিষয়টি পরিষ্কার করার আহ্বান জানান তিনি।
এদিকে সকাল ১০টার দিকে আশুলিয়া শিল্পাঞ্চল পুলিশের পক্ষ থেকে মাইকিং করে শ্রমিকদের শান্ত থাকার আহ্বান জানানো হয়। পুলিশের বার্তায় শিল্পাঞ্চলে শান্তি, শৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা বজায় রাখার পাশাপাশি শ্রমিকদের ন্যায্য দাবি ও অধিকার আদায়ে পাশে থাকার কথা বলা হয়।
গাজীপুরে গোডাউন ও পিকআপে আগুন, ছুটি ৩০ কারখানায়
সাভারের পাশাপাশি গাজীপুরের কালিয়াকৈরেও শ্রমিক আন্দোলনকে কেন্দ্র করে উত্তেজনাকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। উপজেলার চন্দ্রা পল্লীবিদ্যুৎ এলাকায় একটি পোশাক কারখানার ঝুটের গোডাউন ও একটি পিকআপ ভ্যানে অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে। রোববার বেলা সাড়ে ১১টা থেকে সাড়ে ১২টার মধ্যে এসব ঘটনা ঘটে। আন্দোলনের প্রভাবে কালিয়াকৈর এলাকায় অন্তত ৩০টি পোশাক কারখানায় ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে।
সকালে কালিয়াকৈরের রতনপুর এলাকার করনী নিট কম্পোজিট, নিট এশিয়াসহ কয়েকটি কারখানার শ্রমিকেরা কাজে যোগ না দিয়ে সফিপুর বাজার এলাকায় মহাসড়কে অবস্থান নেন। কারখানায় হাজিরা দেওয়ার পর তাঁরা বিক্ষোভ শুরু করেন। পরে আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কায় আশপাশের কয়েকটি কারখানায়ও ছুটি ঘোষণা করা হয়।
প্রত্যক্ষদর্শীদের তথ্যমতে, বেলা সাড়ে ১১টার দিকে পল্লীবিদ্যুৎ এলাকায় একটি পিকআপ ভ্যানে আগুন দেওয়া হয়। আন্দোলন পরিস্থিতির কারণে ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা সময়মতো ঘটনাস্থলে পৌঁছাতে না পারায় গাড়িটি পুড়ে যায়। এর কিছুক্ষণ পর একই এলাকায় ট্রপিক্যাল নামের একটি পোশাক কারখানার ঝুটের গোডাউনে আগুন দেওয়ার ঘটনা ঘটে। খবর পেয়ে কালিয়াকৈর ফায়ার সার্ভিসের একটি ইউনিট ঘটনাস্থলে যাওয়ার চেষ্টা করলেও আন্দোলনরত শ্রমিকদের বাধার মুখে পড়ে।
কালিয়াকৈর ফায়ার সার্ভিসের স্টেশন কর্মকর্তা মো. তরিকুল ইসলাম জানান, চন্দ্রা পল্লীবিদ্যুৎ এলাকায় ট্রপিক্যাল কারখানার গোডাউনে অগ্নিসংযোগের খবর তাঁরা পেয়েছেন। তবে আন্দোলন পরিস্থিতির কারণে ঘটনাস্থলে পৌঁছানো সম্ভব হচ্ছে না।
গাজীপুর শিল্পাঞ্চল পুলিশের পুলিশ সুপার আমজাদ হোসেন বলেন, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ কাজ করছে। শ্রমিক অসন্তোষের কারণে জেলার বিভিন্ন এলাকায় অন্তত ৩০টি কারখানায় ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে।
সাভার ও গাজীপুরের শিল্পাঞ্চলে শ্রমিকদের বিক্ষোভ, কারখানা বন্ধ এবং অগ্নিসংযোগের ঘটনায় উৎপাদন কার্যক্রম ব্যাহত হয়েছে। শ্রমিকদের দাবি ও কারখানা কর্তৃপক্ষের অবস্থান নিয়ে আলোচনা কত দ্রুত শুরু হয়, তার ওপর পরিস্থিতির পরবর্তী গতিপ্রকৃতি অনেকটাই নির্ভর করছে।