ফ্রান্সে সহিংস বিক্ষোভে উত্তাল পরিস্থিতির মধ্যে একদিকে উন্নত শিক্ষাব্যবস্থার দাবিতে শিক্ষার্থীরা, অন্যদিকে জীবনযাত্রার উচ্চ ব্যয়ের প্রতিবাদে বিভিন্ন গোষ্ঠী একত্র হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে বিক্ষোভকারীদের মধ্যে অপ্রত্যাশিত একটি স্লোগান বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে—‘বিসমিল্লাহ, সে লে তেনেব্র’।

আক্ষরিক অর্থে স্লোগানটির তেমন কোনো অর্থ দাঁড়ায় না। তবে বিক্ষোভ আন্দোলনের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা নানা অসন্তোষকে শিক্ষার্থীরা এই অর্থহীন বাক্যের মাধ্যমে তুলে ধরছেন।

পুলিশের বর্ণবাদী দৃষ্টিভঙ্গি ও জাতিগত গৎবাঁধা ধারণাকে ব্যঙ্গ করতেই স্লোগানটি ব্যবহার করা হচ্ছে।
গত সপ্তাহান্তে দেশজুড়ে লাখ লাখ মানুষ রাস্তায় নেমে আসেন।

গত মাসে শিক্ষা সংস্কার ও নিত্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধির প্রতিবাদে বিক্ষোভ শুরুর পর এটিই ছিল সবচেয়ে বড় গণজমায়েত। শ্রেণিকক্ষে অতিরিক্ত শিক্ষার্থীর চাপ, শিক্ষকের সংকট, কাঠামোগত বৈষম্য এবং সুযোগের অভাবসহ নানা অসন্তোষ থেকে এই আন্দোলনের সূত্রপাত।
পুলিশের আচরণও এখন ব্যাপক পর্যালোচনার মুখে পড়েছে। বিক্ষোভ শুরুর পর থেকে পুলিশের বিরুদ্ধে সহিংসতার অভিযোগে ফ্রান্সের পুলিশ পরিদর্শন সংস্থা আইজিপিএন (আইজিপিএন) কয়েক ডজন তদন্ত শুরু করেছে।

স্লোগানটির অর্থ কী?
‘বিসমিল্লাহ’ আরবি শব্দ। এর অর্থ ‘আল্লাহর নামে’। মুসলিমরা কোনো কাজ শুরু করার আগে সাধারণত এই কথাটি বলেন। তবে ফরাসি কথ্য ভাষায় শব্দটি তার মূল অর্থ কিছুটা হারিয়েছে। এখন এটি অনেকটা ‘চলো, শুরু করা যাক’, এমন অর্থেও ব্যবহৃত হয়।

অন্যদিকে, ‘সে লে তেনেব্র’ কথাটির আক্ষরিক অর্থ ‘এটি অন্ধকার’। এর মাধ্যমে হতাশাজনক ও আশাহীন পরিস্থিতি বোঝানো হয়।

সুতরাং পুরো স্লোগানটির অর্থ দাঁড়ায়, ‘আল্লাহর নামে, এ তো অন্ধকার’। তবে বাক্যটি নিজে থেকে কোনো সুস্পষ্ট বার্তা দেয় না।

স্লোগানটির উৎপত্তি কোথায়?
শিক্ষার্থীদের দাবি, বিক্ষোভকারীদের মধ্যে যোগাযোগ ও কর্মসূচির সমন্বয়ে ব্যবহৃত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের গ্রুপগুলোতে পুলিশের অনুপ্রবেশের চেষ্টাকে ব্যঙ্গ করতেই স্লোগানটি তৈরি হয়েছে।

অক্টোবরের শুরুর দিকে স্ন্যাপচ্যাটের একটি কথোপকথনের স্ক্রিনশট ছড়িয়ে পড়ে। সেখানে ‘মামাদু’ নামের এক ব্যবহারকারী একটি গ্রুপে যুক্ত হওয়ার অনুরোধ জানিয়ে লেখেন, ‘হাই, আল্লাহর নামে, এ তো অন্ধকার। অবরোধ কখন, ওয়াল্লাহ, ভাই?’ বার্তাটিতে আলজেরিয়ার পতাকার ইমোজিও ছিল।

শিক্ষার্থীদের দাবি, বিক্ষোভকারীদের কথোপকথনে অনুপ্রবেশের চেষ্টা করা ছদ্মবেশী পুলিশ কর্মকর্তারাই বার্তাটি পাঠিয়েছিলেন। তাদের মতে, আরবি শব্দ ও কথ্য ভাষার অবিশ্বাস্য মিশ্রণ ব্যবহার করায় বার্তাটি সন্দেহজনক মনে হয়েছে। তবে এ দাবি যাচাই করা যায়নি এবং ফরাসি কর্তৃপক্ষও এ বিষয়ে কোনো বক্তব্য দেয়নি।

প্যারিস ৮ ভিনসেনেস-সেন্ট ডেনিস বিশ্ববিদ্যালয়ের আরব ও ভূমধ্যসাগরীয় সমাজবিজ্ঞানের সহযোগী অধ্যাপক ইউসুফ এল চাজলি বলেন, এই বাক্যটি ‘বাস্তবতা থেকে বিচ্ছিন্ন এবং গৎবাঁধা ধারণায় আচ্ছন্ন পুলিশ সদস্যদের একটি ভাবমূর্তি আরও জোরালো করে’।

তিনি আল জাজিরাকে বলেন, ‘এ ধরনের গৎবাঁধা ধারণা আরব ও আফ্রিকান বংশোদ্ভূত তরুণদের লক্ষ্য করেই অসামঞ্জস্যপূর্ণভাবে বেশি প্রয়োগ করা হয় বলে মনে হয়। বর্তমান আন্দোলন সম্পর্কে রাষ্ট্রীয় সংস্থাগুলো কতটা বাস্তবতা-বিচ্ছিন্ন, এটি তার আরও একটি উদাহরণ।’

আন্দোলন সম্পর্কে কী বার্তা দিচ্ছে স্লোগানটি?
বর্ণবাদী গৎবাঁধা ধারণাকে ব্যঙ্গ করতে এবং তরুণদের বাস্তবতা সম্পর্কে কর্তৃপক্ষের অজ্ঞতা তুলে ধরতে স্লোগানটি লেখা হয়েছে কার্ডবোর্ডের প্ল্যাকার্ডে। এর মধ্য দিয়ে তরুণদের জীবনযাপনের বাস্তবতা থেকে কর্তৃপক্ষ কতটা বিচ্ছিন্ন, তা প্রকাশ করা হচ্ছে।

স্লোগানটি ইতালিতে ও বেলজিয়ামেও ছড়িয়ে পড়েছে। গত সপ্তাহান্তে ওই দুই দেশেও জীবনযাত্রার উচ্চ ব্যয় ও শিক্ষাব্যবস্থার দুরবস্থার প্রতিবাদে একই ধরনের বিক্ষোভ হয়েছে।

ইউসুফ এল চাজলি বলেন, বিক্ষোভের সময় ব্যঙ্গাত্মক মিম ও ইন্টারনেটের বিভিন্ন প্রবণতা রাজনৈতিক অসন্তোষ প্রকাশের হাতিয়ার হয়ে উঠেছে। ঐতিহ্যগতভাবেই বিক্ষোভের ভাষা ছিল ‘উদ্ভাবনী ও সৃজনশীল’।

তিনি বলেন, ‘তরুণদের আন্দোলনে প্রতিবাদের সৃজনশীলতা অনেকাংশেই তরুণদের নিজস্ব উপসংস্কৃতি থেকে অনুপ্রেরণা পাবে।’

ইসলামবিদ্বেষের বিষয়টিও জনপরিসরের আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ফ্রান্সে ইসলামবিদ্বেষমূলক কর্মকাণ্ড উল্লেখযোগ্য হারে বেড়ে গেলেও দেশটির কর্তৃপক্ষ এ বিষয়ে প্রকাশ্যে মন্তব্য করতে অনীহা দেখিয়েছে।

বার্তা সংস্থা রয়টার্সের গত বছরের একটি প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে মার্চ এই তিন মাসে ফ্রান্সে ইসলামবিদ্বেষমূলক ঘটনার সংখ্যা ২০২৪ সালের একই সময়ের তুলনায় ৭২ শতাংশ বেড়েছিল।

ফ্রান্সের কট্টর ডানপন্থিরা দ্রুত বর্ণবাদী ভাষা ব্যবহার করে সহিংসতার জন্য মুসলিম তরুণদের দায়ী করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও এ বিষয়ে মন্তব্য করে দাবি করেছেন, এটি ‘ইসলামের আধিপত্য বিস্তারের চেষ্টা’।

ইউসুফ এল চাজলি বলেন, ‘২০ বছর আগে যে বিষয়টি নিয়ে আলোচনাই হতো না, এখন তা বিতর্কের বিষয় হয়ে উঠেছে। তরুণ প্রজন্মের মধ্যে আরব ও আফ্রিকান সংস্কৃতির প্রভাব ধীরে ধীরে তরুণদের উপসংস্কৃতির মূলধারায় জায়গা করে নিচ্ছে। খেলাধুলা ও শিল্পাঙ্গনের ব্যক্তিত্বদের পাশাপাশি নতুন রেডিও অনুষ্ঠান এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিভিন্ন কনটেন্ট এ ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখছে।’